অরুণ দাশগুপ্ত সাংবাদিক ও কবির প্রস্থান


অজয় দাশগুপ্ত: অরুণ দাশগুপ্ত অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। তিনি রাজধানীতে থাকতেন না। চট্টগ্রামের মানুষ। লেখাপড়া বেশিরভাগই করেছেন কলকাতায়। কিন্তু চট্টগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান সেখানে থাকতে পারেননি। থাকতে চাননি পরদেশে। দেশে চলে এসেছিলেন মাতৃভ‚মির টানে। অনায়াসে করতে পারতেন আয়েশি বিলাসী জীবন। ওয়াদ্দেদার পরিবার বা এই পদবি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পর শুনিনি। যদিও পরে তারা দাশগুপ্ত পদবি ধারণ করেন। দেশে ফিরে প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক পরে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক আজাদীর সাহিত্য সম্পাদক। এই পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য রাজনীতিবিদ, যিনি ভোটযুদ্ধে হারিয়েছিলেন মুসলিম লীগের ফজলুল কাদের চৌধুরীকে। বাকশালের আমলে গবর্নরও হয়েছিলেন। পরে রাজনীতি ছেড়ে আসেন সাংবাদিকতায়। তার হাত ধরে বন্ধুতুল্য অরুণ দাশগুপ্ত সাহিত্য সম্পাদক হয়ে পালন করেছিলেন চট্টগ্রামের সাহিত্য জগতে অভিভাবকের দায়িত্ব।

অজস্র কবি লেখক গুণী মানুষের অভিভাবক ছিলেন তিনি। আজকে যারা নাম করা লেখক কবি-সাহিত্যকর্মী তাদের অনেকের হাতে খড়ি আজাদীতে। আর সে বড় হয়ে ওঠার গল্পের নেপথ্য নায়ক ছিলেন তিনি। দীর্ঘকাল তার বাড়ির আড্ডায় থাকার সুবাদে দেখেছি, জেনেছি কতটা গভীর ছিল তার জ্ঞান। কত বিচিত্র বিষয়ে পড়াশোনা ছিল। সঙ্গীত বিষয়ে তাঁর অভ‚তপূর্ব ধারণা আর জানার পরিধি আমরা পেয়েছি লিখে যাওয়া একটি বইতে।

প্রিয়ভাজন শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফের পোস্টটা দেখে হজম করার আগেই দেখি বন্ধু ওমর কায়সারের মেসেজ। আমাদের প্রিয় অরুণ দা সকলের দাদামণি শেষ বিদায় জানিয়েছেন তার জন্মভ‚মিকে। দূর দেশের এক শহরে বর্ষণক্লান্ত দুপুর আমাকে নিয়ে গেল অনেক দূরে। আমার যৌবন ও যৌবন পেরিয়ে আসা দিনগুলোতে। সে এক আশ্চর্য বিস্ময়ের সমাজ। এখনকার চাইতে অগ্রসর ও মেধায় আলোকিত দেশ। যেখানে আমরা সাহিত্য শিল্প চর্চা করতাম প্রাণের আনন্দে। চট্টগ্রামের শিল্প-সাহিত্যের মুখপত্র আজাদীর সাহিত্য সম্পাদক অরুণ দা ছিলেন লেখক তৈরি ও সমাজ নির্মাণের নেপথ্য কারিগর। প্রচারবিমুখ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার পরও নিরাসক্ত এক মানুষ।

তাকে নিয়ে কিছু লেখা আমার জন্য দুরূহ। একদিকে যেমন ঋণের বোঝা, অন্যদিকে অসংখ্য অসামান্য সব স্মৃতি। সীমিত পরিসরে এমনকি বিপুলায়তনেও সবকিছু লেখা অসম্ভব। চিনতাম কৈশোরকাল থেকেই। বিশেষত নন্দনকানন ও লাভ লেনে বড় হওয়ায় তার বাড়িটি বলা উচিত তার থাকার জায়গাটি ছিল হাতের মুঠোয়। কিন্তু পথেঘাটে দেখা হলে একঝলক কুশল বিনিময় বা টুকটাক কথা ছাড়া তেমন সম্পর্ক ছিল না। আমরা তখন ঢাকার তথা জাতীয় নামে পরিচিত দৈনিক সাপ্তাহিক মাসিকের নিয়মিত লেখক। আমাদের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু রাজধানী। এর বাইরে তখন আমরা কবিতা নিয়ে একটি পাঠচক্রে নিমগ্ন।

সাংবাদিক ও কবি অরুণ দাশগুপ্ত

আশির দশকের শেষদিকে নানা কারণে আমি আমার মতো চলার সিদ্ধান্ত নেই। নানা ঘটনা ও ঝুট- ঝামেলায় এটা পরিষ্কার হয়ে পড়ে অভিভাবক বলে মান্য করার মানুষ নিজে ওপরে ওঠা ব্যতীত কিছু বোঝেন না। যৌবনের স্বভাবধর্মে তখন কাছের জনদের সঙ্গেও সম্পর্ক হয়ে ওঠে অম্লমধুর।

এমন কঠিন সময়ে তার সঙ্গে গড়ে ওঠে নিবিড় এক সম্পর্ক। আজাদীও তখন নতুন ভাবে নবরূপে বেরিয়ে আসার জন্য মুখিয়ে। রাশেদ রউফের মতো তরুণ তুর্কীরা ঢুকেছে আজাদী হাউসে। বন্ধুপ্রতিম প্রদীপ দেওয়ানজী, বিজ্ঞ ইউসুফ ভাই, সবার ওপর প্রয়াত সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ-সব মিলিয়ে রসঘন গুরুত্বপূর্ণ আড্ডা। বলাবাহুল্য, আড্ডার জায়গা এনায়েত বাজার বৌদ্ধ মন্দিরের উল্টো দিকের ছায়াঘন এক বাড়ি। ডাঃ কেশব সেনের সেই বাড়িটি হাত-বেহাত হতে হতে এখন এক বহুতল ভবন। তখনকার দোতলা বাড়ির ঢোকার মুখে একতলার বাঁ দিকে একটি ঘরে থাকতেন তিনি। হররোজ যেতে যেতে এমন অবস্থা হয়ে গেল সে বাড়ির কেয়ার টেকার থেকে শুরু করে গাছপালাও চিনে নিয়েছিল আমাকে।

ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম তার মেধা ও মনন কতটা পরিশীলিত। কি পরিমাণ জানাশোনা ও পড়ালেখা। শিল্প সাহিত্য সঙ্গীত সব বিষয়ে জ্ঞান ছিল অসামান্য। চট্টগ্রামের হেন কোন কবি-লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদ নেই, যারা সেখানে যেতেন না। আওয়ামী লীগের মেয়র মহিউদ্দিন ভাই, অন্যদিকে বিএনপির নোমান ভাই উভয়কে দেখেছি তার বাসায়। দুজনই এসেছিলেন দোয়া চাইতে। কয়েক শ’ কবি-লেখক-সাহিত্যকর্মীর জন্মদাতা তিনি।

সে আড্ডায় মসজিদের ইমাম থেকে চট্টেশ্বরী কালীবাড়ির পুরোহিত সবাই আসতেন। লাকী হোটেলের চা সমুচা বিস্কুট অমৃতি চলত সমানে। অন্য পত্রিকার সাংবাদিকরাও আসতেন। এমন মিলনস্থল দেখিনি আর।

সময় গড়িয়ে সম্পর্ক গভীর হলে অনেক অজানা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করতেন। একসময় এমন হয়ে গেল যে তিনি কোথাও গেলেই নিয়ে আসতেন কোন না কোন উপহার। দিল্লী থেকে এনে দেয়া গান্ধীর অটোবায়োগ্রাফি এখনো শোভা পাচ্ছে আমার সিডনির বাড়ির বইয়ের সেলফে।

অধিকারবোধ থেকে ঝগড়াও হতো মাঝে মাঝে। অভিযোগ ছিল, তিনি তার কথার প্রেমে পড়ে লেখা খুইয়ে ফেলছেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তার হয়ত একটি বা দুটি গ্রন্থ ছিল হয়তবা একটিও নয়। ভয় পেতাম সময় কি এই জনপ্রিয় সাহিত্য সম্পাদক ও অতিথি বৎসল মানুষটিকে মনে রাখবে? কবিতা শিল্প নিয়ে চায়ের আড্ডায় একটু আগে ফাটাফাটি করে আসা দু’দল কবি, লেখক এসে একসঙ্গে চা পান করতেন তার বাসগৃহে। এমন ক্যারিশমার পরও তাকে মনে রাখব কি আমরা?

পোড়ার সমাজে সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। চট্টগ্রাম যতই রাজস্বের জোগান দিক, যতই মেধার সাম্রাজ্য হোক ঢাকার একচোখা দৃষ্টিতে মফস্বল। আর এই মফস্বলের হৃদয়বান মেধাবী সাহিত্য সম্পাদককে তারা না চিনবে, না সম্মান জানাবে। আজ যখন তার চলে যাওয়ার খবর পেলাম মনে হলো মানুষটি না পেয়েছেন কোন জাতীয় পুরস্কার পদক, না সম্মাননা। না জানতেন লবিং না তৈলমর্দন।

সবাই তাকে ডাকত দাদামণি বলে। ইচ্ছে করেই আমি ডাকতাম দাদা। অনেকে এও মনে করতেন পদবি দাশগুপ্ত বলে তিনি আমার বড় দাদা। দাদা তো বটেই। তবে রক্তীয় কেউ না হলেও আত্মার আত্মীয় । দীর্ঘ সময়ের এক স্বজন বড় ভাই এবং অভিভাবক হারানো সিডনির সজল সন্ধ্যাটি দু’চোখ ছলছল করে দিলেও কাঁদব না আমি। বরং বলব, দেখো অরুণ দাশগুপ্তকে দেখো। শেখো জীবনকে উদযাপন করা কাকে বলে। শেষ বয়সে নিঃসঙ্গ যাত্রা হলেও সারা জীবন মানুষের মনে ছিলেন, থাকবেন অরুণ দাশগুপ্ত।

প্রণাম দাদা।

লেখক : সিডনি প্রবাসী

dasguptaajoy@hotmail.com

কৃতজ্ঞতা: লেখাটি দৈনিক জনকন্ঠ থেকে সংগৃহিত

,

Leave a Reply

Your email address will not be published.