ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সাংবাদিক গ্রেপ্তার


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় ঠাকুরগাঁওয়ে সাংবাদিক তানভীর হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১১ জুলাই) রাত আটটার দিকে সদর থানায় এক মামলার খোঁজখবর নিতে গিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন।

তানভীর হাসান দৈনিক ইত্তেফাক ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজেরও জেলা প্রতিনিধি। ঠাকুরগাঁও সদর থানার ওসি তানভিরুল ইসলাম তাঁর গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ জানায়, গত শুক্রবার ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক নাদিরুল আজিজ বাদী হয়ে সাংবাদিক তানভীর হাসান, নিউজবাংলা ২৪ ডট কমের প্রতিনিধি রহিম শুভ্র ও বাংলাদেশ প্রতিদিন–এর জেলা প্রতিনিধি আবদুল লতিফের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৫ জুলাই জাগো নিউজে ঠাকুরগাঁও হাসপাতালের করোনা ইউনিটের খাবারের মান নিয়ে ‘দিনে বরাদ্দ ৩০০ হলেও করোনা রোগীদের খাবার দেওয়া হচ্ছে ৭০ টাকার!’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে আরও কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।  

তানভীর হাসান তানু

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের বলা হয়েছে:

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে শনিবার রাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিককে জামিন দিয়েছে আদালত। রবিবার দুপুরে মি. হাসানকে আদালতে হাজির করে পাঁচদিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ, কিন্তু রিমান্ড নামঞ্জুর করে জামিন দেয়।

মি. হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সদর হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের মান নিয়ে একটি “মিথ্যা ও ভিত্তিহীন” প্রতিবেদন করার মাধ্যমে হাসপাতালটির “মানহানি” করেছেন।

গতরাতে এই গ্রেপ্তারের ঘটনার পর আজ সকালের কিছু ছবি বিবিসির হাতে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মি. হাসান হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন, তার হাতে হাতকড়া লাগানো।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারের পর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এই হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষই মি. হাসানের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে। আজই মি. হাসানকে আদালতে হাজির করা হবে বলেও পুলিশ জানাচ্ছে। মি. হাসানের পরিবার বলছে, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ, তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হোক।

এদিকে এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় ঠাকুরগাঁওয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে শনিবার রাতেই বিক্ষোভ করেছে ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাব। 

কী হয়েছিল ঠাকুরগাঁওয়ে?

ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বিবিসিকে বলেন, আধুনিক সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক নাদিরুল আজিজ বাদী হয়ে শুক্রবার তিনজন সাংবাদিকের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করেছেন। তানভীর হাসান তানু সেই মামলার প্রধান নম্বর আসামি।

মি. হোসেন জানান, মি. হাসানকে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি সেখানে মামলার খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন।

মি. হাসানের বড় ভাই মাহবুব আলম সোহাগ বিবিসিকে জানিয়েছেন, এ মাসের শুরুতে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সরবারহ করা খাবারের মান নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

মি. হাসান জাগোনিউজ টুয়েন্টিফোর নামেও একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করেন, এবং উল্লেখিত খবরটি সেখানেই প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রকাশিত ওই খবরকে “মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং মানহানিকর” উল্লেখ করে ৯ই জুলাই ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করে বলে পুলিশ জানিয়েছে। 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে যে, ওই সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্য অসৎ।

রিপোর্টটির মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে এজাহারে।

তানভীর হাসান তানু ছাড়াও ওই একই রিপোর্ট আরো কয়েকজন সাংবাদিক করেছিলেন, যে কারণে তার সঙ্গে মামলায় আসামি করা হয় আরো দুইজন সাংবাদিককে।

পুলিশ জানিয়েছে, তানভীর হাসান তানুকে আজ পরের দিকে আদালতে হাজির করার হবে।

বাংলাদেশে মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্য খাত ও হাসপাতাল বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ দেখা যাচ্ছে।

মাত্র কয়েকদিন আগে ঢাকার সিভিল সার্জন একটি নোটিশ জারি করে হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের গণমাধ্যমকে তথ্য দিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।

এদিকে, তানভীর হাসান তানুর বড়ভাই মি. আলম বিবিসিকে বলেছেন, তার ভাই করোনাভাইরাস আক্রান্ত ছিলেন। 

মাত্র গতকালই তানভীর হাসানের কোভিড-১৯ রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।

মি. আলম বলেন, “সন্ধ্যায় একটি খবরের বিষয়ে খোঁজ নিতে থানায় গিয়ে গ্রেপ্তার হয় সে। করোনার কারণে এমনিতেই তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা ছিল কিছুটা। পরে রাতে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়।”

“আমার ভাই অসুস্থ, আমরা চাই তাকে কারাগারে বা হাসপাতালে না রেখে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হোক।”

এদিকে, তানভীর হাসান তানুকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে শনিবার রাতেই বিক্ষোভ করেছেন ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাব।

আজ রোববারও একটি মানববন্ধন কর্মসূচী পালনের ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।


Leave a Reply

Your email address will not be published.